প্রবাস জীবন: কিছু না বলা অনুভূতির গল্প : জেএম.কর দিবস
প্রবাস জীবন বাইরে থেকে যতটা সুন্দর দেখায়, ভেতর থেকে ততটাই নিঃসঙ্গ। মানুষ ভাবে প্রবাসীরা অনেক টাকা উপার্জন করে, ভালো থাকে, সুখে থাকে। কিন্তু কেউ দেখে না তাদের বুকের ভেতরে জমে থাকা কষ্টগুলো, যা তারা প্রতিদিন হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখে।
প্রবাসে থাকি, কিন্তু মনটা পড়ে থাকে হাজার মাইল দূরে নিজের বাড়িতে। মায়ের মুখটা দেখতে ইচ্ছে করে, বাবার স্নেহভরা ডাক শুনতে ইচ্ছে করে, পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে বসে খাবার খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও সব সময় তা সম্ভব হয় না। কারণ প্রবাসীর জীবন মানেই নিজের স্বপ্ন আর পরিবারের হাসির জন্য নিজের সুখকে বিসর্জন দেওয়া।
ঈদের দিন যখন সবাই নতুন পোশাক পরে পরিবার নিয়ে আনন্দ করে, তখন প্রবাসী মানুষটা হয়তো কোনো ছোট্ট রুমে একা বসে মোবাইলের স্ক্রিনে পরিবারের হাসিমুখ দেখেই চোখের জল লুকায়। ফোন কেটে যাওয়ার পর নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কারণ সে জানে তার কষ্টের কথা বললে বাড়ির মানুষগুলোও কষ্ট পাবে।
প্রবাসে অসুস্থ হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। মন খারাপ হলে পাশে বসে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো আপনজন থাকে না। তবুও প্রতিদিন নিজেকে শক্ত করে রাখতে হয়। কারণ তার দুর্বল হওয়ার অধিকার নেই; তার পেছনে অপেক্ষা করে আছে একটি পরিবার, যারা তার পাঠানো টাকার উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে।
প্রবাসী মানুষগুলো আসলে নিজের জন্য বাঁচে না। তারা বাঁচে পরিবারের স্বপ্ন পূরণের জন্য। নিজের চোখের জল চেপে রেখে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর নামই যেন প্রবাস জীবন।
অনেক রাত আছে, যখন কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে শুধু একটা কথাই মনে হয়—”আর কতদিন?” কিন্তু পরক্ষণেই পরিবারের কথা মনে পড়ে, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা মনে পড়ে, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে। তখন আবার নতুন করে শুরু হয় সংগ্রাম।
প্রবাস জীবন শুধু বিদেশে থাকা নয়; প্রবাস জীবন মানে হাজারো না বলা কষ্ট, অসংখ্য ত্যাগ, বুকভরা অপেক্ষা আর একদিন নিজের মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন। প্রবাসীরা হয়তো দূরে থাকে, কিন্তু তাদের হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন নিজের জন্মভূমি আর প্রিয়জনদের জন্যই ধ্বনিত হয়।
প্রবাসীর হাসিটা দেখলে সবাই সুখ দেখে, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কান্নার শব্দটা খুব কম মানুষই শুনতে পায়।