
জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টার বিদায়ী ভাষণ
পিবিএন ডেস্ক: দীর্ঘ ১৮ মাস দায়িত্ব পালনের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া আবেগঘন বিদায়ী ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “আমরা শূন্য থেকে শুরু করিনি—শুরু করেছি মাইনাস থেকে। ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে তারপর সংস্কারের পথ ধরেছি।”
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। নির্বাচনে বিজয়ী ও পরাজিত—উভয় পক্ষকেই অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, “হার-জিতই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।”
চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব গ্রহণের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশ তখন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে নিমজ্জিত ছিল। ছাত্রনেতাদের আহ্বানে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে দায়িত্ব নেন তিনি।
দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনটি মূল অঙ্গীকার ছিল—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন।
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে এবং ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার অধিকাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করতে পৃথক সচিবালয়, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো ও আইন সংস্কার করা হয়েছে। গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল ভঙ্গুর। থানাগুলো পুলিশশূন্য ছিল। ধাপে ধাপে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, “আজ পুলিশ আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না, বেআইনিভাবে কাউকে তুলে নিয়ে যায় না।”
জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গঠনে নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অর্থনৈতিক খাতে ব্যাপক বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, বিপুল অর্থ পাচার হয়েছিল। তবে সংস্কারের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ বিলিয়ন ডলার, এবং প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে তা আরও বাড়ছে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে সরবরাহ বৃদ্ধি, টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও বাজার তদারকি জোরদার করা হয়েছে।
এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষ অর্জন হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
পররাষ্ট্রনীতিতে ‘নতজানু অবস্থান’ থেকে বেরিয়ে সার্বভৌম স্বার্থভিত্তিক অবস্থান গ্রহণের কথা উল্লেখ করেন। রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুনরায় আলোচনায় আনার কথাও বলেন।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে রেসিপরোকাল ট্যারিফ ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে এবং জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে শিল্প বহুমুখীকরণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার এবং তিস্তা প্রকল্পে অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
দীর্ঘ সময়ের অবহেলার পর সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যৎ সরকার এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে তিনি ‘জুলাই সনদ’-এর কথা উল্লেখ করেন, যা গণভোটে অনুমোদন পেয়েছে। তার ভাষায়, “এই সনদ বাস্তবায়িত হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ চিরতরে বন্ধ হবে।”
গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণে পলাতক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনকে জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন তিনি। দেশ-বিদেশের নাগরিকদের জাদুঘর পরিদর্শনের আহ্বান জানান।
ভাষণের শেষাংশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন,
“গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও বাকস্বাধীনতার যে চর্চা শুরু হয়েছে—তা যেন কখনো থেমে না যায়।”
দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি দায়িত্ব থেকে বিদায় নেন।















