আন্তর্জাতিক, ওমান মাস্কাট: ওমানে অবস্থিত নেপাল দূতাবাসের আয়োজনে ‘সাগরমাথা দিবস’ (মাউন্ট এভারেস্ট দিবস) উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে ওমানের নারী পর্বতারোহী নাদিরা আল হার্থি এভারেস্ট জয়ের পথচলা এবং জীবনের নানা সংগ্রামের অনুপ্রেরণামূলক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
ওমানের স্থানীয় গণমাধ্যম টাইমস অব ওমানের এক প্রতিবেদনে তার একটি বক্তব্য তুলে ধরেন। বক্তব্য দিতে গিয়ে নাদিরা স্মরণ করেন তার পর্বতারোহণ জীবনের শুরুতে পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ। তাকে বলা হয়েছিল, “একদিন তুমি ফিরে তাকিয়ে গর্ব অনুভব করবে যে তুমি হাল ছাড়নি।” সেই কথাগুলো স্মরণ করে আবেগাপ্লুত নাদিরা বলেন, “আজ যখনই আমি এভারেস্টের কথা বলি, সেই কথাগুলো মনে পড়ে। আলহামদুলিল্লাহ, আমি হাল ছাড়িনি।”
তিনি প্রয়াত আল সিয়াবির প্রতিও শ্রদ্ধা জানান। পরবর্তী অভিযানে তার স্মৃতি ও নাম নিজের সঙ্গে বহন করেছেন বলেও উল্লেখ করেন।
বক্তৃতায় নাদিরা উচ্চপর্বতারোহণের কঠিন বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন। ভয়াবহ ঝড়, চরম ক্লান্তি, তুষারদংশন এবং প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্য দিয়ে পর্বতারোহীদের পথচলার বর্ণনা দেন তিনি।
তিনি বলেন, “শুধু চূড়ায় ওমানের পতাকা ওড়ানোর বিষয় নয়। প্রতিটি ছবির পেছনে রয়েছে ভয়, কষ্ট, নিঃসঙ্গতা ও অসংখ্য ত্যাগের গল্প।”
অভিযানের সময় সহযাত্রীদের হারানোর বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথাও শেয়ার করেন নাদিরা। তিনি জানান, কে-টু অভিযানে আফগান পর্বতারোহী আলি আকবরকে হারিয়েছেন এবং পাকিস্তানের পাহাড়ে কয়েকজন শেরপা সঙ্গীকেও হারাতে হয়েছে।
“কখনও কখনও আমরা পাহাড়ে মৃতদেহও দেখতে পাই। আমরা সবাই একই স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাই, কিন্তু পাহাড় আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবন কতটা ভঙ্গুর,” বলেন তিনি।
মাউন্ট এভারেস্ট জয় করার পর নাদিরা বিশ্বের আরও কয়েকটি কঠিন শৃঙ্গ জয়ের অভিযান চালিয়ে যান। তিনি প্রথম আরব নারী হিসেবে আমা দাবলাম শৃঙ্গে আরোহণ করেন। এছাড়া বিশ্বের অষ্টম সর্বোচ্চ পর্বত মানাসলু-তেও সফলভাবে আরোহণ করেন।
পরবর্তীতে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্বতগুলোর একটি কে-টু জয় করেন। এরপর গাশেরব্রুম-২ এবং ‘কিলার মাউন্টেন’ নামে পরিচিত নাঙ্গা পার্বত-ও জয় করেন।
সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পর্বতারোহণ তাকে ধৈর্য, বিনয় এবং মানবিক বন্ধনের মূল্য শিখিয়েছে বলে জানান নাদিরা। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের পর্বতারোহীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব, একসঙ্গে খাবার ভাগাভাগি এবং ভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ তাকে সমৃদ্ধ করেছে।
ওমানের তরুণ প্রজন্মকে প্রকৃতি ও অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রমের প্রতি আগ্রহী করে তুলতেও কাজ করছেন তিনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় অ্যাডভেঞ্চার গ্রুপগুলোর সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের জন্য ট্রেকিং ও পর্বত অনুসন্ধান কর্মসূচি পরিচালনা করছেন।
নাদিরা বলেন, “প্রকৃতি থেকে শেখার এখনও অনেক কিছু বাকি। প্রতিটি পাহাড় আমাদের নতুন কিছু শেখায়।”
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি সবাইকে স্বপ্নপূরণের জন্য সাহস ও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “আমাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব একটি এভারেস্ট আছে। হয়তো আপনার এভারেস্ট আমারটার মতো নয়, কিন্তু বিশ্বাস ধরে রাখতে পারলে এবং কখনও হাল না ছাড়লে স্বপ্ন অবশ্যই বাস্তবে রূপ নেয়।”